ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদ, বাগেরহাট


বাগেরহাট জেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এই ষাট গম্বুজ মসজিদ। অপূর্ব কারুকার্য খোচিত বাংলাদেশের বৃহত্তম আয়তার (দের্ঘ্য ৪৮.৮০ মিটার ও প্রস্থ ৩২.৯৫ মিটার) প্রাচীন এই মসজিদ পনর শতকে নির্মিত হয়। এই মসজিদের বিশেষ দিক হল স্থাপত্য কৌশলে লাল পোড়ামাটির উপর লতা-পাতার অলংকরণে মধ্যযুগীয় ধাচে নির্মিত। তাই বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর এবং আকর্ষণীয় স্পট এটি। দেশি বিদেশি পর্যটকের পদচারনায় মুখরিত হযে ওঠে এই পর্যটন স্পটটি।

       

ষাট গম্বুজ মসজিদের নামকরনে বিভিন্ন ঐতিহাসিকগন তাদের বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন সাতটি সারিবদ্ধ গম্বুজ সারি আছে বলে এর নাম করন হয়েছে সাত গম্বুজ; তা থেকে পরর্বতীতে ষাট গম্বুজ। আবার অনেকের ব্যাখ্যা হল ৬০(ষাট)টি প্রস্তর র্নিমিত স্তম্ভের ওপর গম্বুজ গুলো দাড়িঁয়ে আছে বলে এর নাম করন হয়েছে ষাট গম্বুজ মসজিদ।প্রকৃতপক্ষে চতুষ্কোণ বুরুজের ওপর ০৪(চার)টি গম্বুজসহ এতে সর্বমোট গম্বুজের সংখ্যা ৮১(একাশি)। ধারনা করা হয় এটি প্রাচীন রাজধানী শহরের প্রশাসনিক কেন্দ্র তথা দরবার হল ও জামে মসজিদ। খ্রিষ্টীয় পনর শতকে খান-ই-জাহান পদবীধারী একজন সাধক-যোদ্ধা বর্তমান বাগেরহাট শহরের পশ্চিম প্রান্তে একটি শহর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।মুদ্রা প্রমানের ওপর ভিত্তি করে পন্ডিতগন মনে করেন যে, খ্রিষ্টীয় ষোল শতকের দিকে এই মসজিদটি খলিফাতাবাদ নামে পরিচিত ছিল।

       

এই সমৃদ্ধ শহরটি অসংখ্য মসজিদ,জলাশয়,রাস্তা,সমাধি সৌধ দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল। যার অধিকাংশই আজ বিলুপ্ত। টিকে থাকা নিদর্শণ সমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে এই ষাট গম্বুজ মসজিদ, সিঙ্গাইর মসজিদ,রেজাখোদা মসজিদ,চুনাখোলা মসজিদ,নয় গম্বুজ মসজিদ, বিবিবেগনী মসজিদ, রনবিজয়পুর মসজিদ,খান জাহানের সমাধিসৌধ, জিন্দাপীরের মাজার ও মসজিদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।এগুলো পূর্ব – পশ্চিমে ২.৫(দুই দশমিক পাচঁ) কি. মি এবং উত্তর – দক্ষিণে ০৬(ছয়) কি.মি. এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। সমগ্র মানবজাতির কাছে স্থাপ্ত্যিক নিদর্শণ হিসেবে বিশ্বজনীন গুরুত্ব থাকায় বাগের হাটের পুরার্কীতি সমূহ ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অর্ন্তভূক্ত হয়।

        এক নজরে ষাট গম্বুজ মসজিদঃ

মসজিদের নির্মাতা – খান-উল –আযম উঘুল খান – ই- জাহান।

বৈশিষ্ট সূচক উপাধি – বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ আয়তাকার মসজিদ।

উপাধি – খান জাহান।

মৃত্যুসাল-১৪৫৯খ্রিঃ।

নির্মানকাল- পঞ্চদশ শতাব্দী।

ব্যবহ্রত নির্মান উপকরণ-পোড়ামাটির তৈরি টালিইট, চুনসুরকী, পাথর ও টেরাকোটা ।

মসজিদের পরিমাপ- (দের্ঘ্য ৪৮.৮০ মিটার ও প্রস্থ ৩২.৯৫ মিটার) ( বাহ্যিক)।

খাম্বা- ৬০(ষাট)টি ।

দেয়ালের প্রশস্ততা – ২.৭৪ ( দুই দশমিক সাত চার) মিটার।

গম্বুজ – ৭৭+৪ = ৮১ ( একাশি) টি।

গোলাকার গম্বুজ – ৭০ (সত্তর) টি।

চারচালা গম্বুজ – ০৭ (সাত)টি।

কর্নার বুরুজ – ০৪ (চার)টি।

খিলান দরজা – ১১+৭+৭=২৫(পচিঁশ) টি।

কেবলা দেয়ালে বিশেষ দরজা – ০১ (এক) টি।

স্থাপত্যিক প্রভাব-তুরস্ক ।

       

চাকুরির সুবাদে ট্রেনিংয়ে খুলনা যাই। আট দিনের ট্রেনিং একদিন ছিল সাইট ভিজিট। আর এই সুযোটা কাজে লাগাই আমি আর আমার বন্ধু বাপন সেন। যদিও বন্ধু আমার ষাট গম্বুজ মসজিদ একবার ঘুরে এসেছে। কিন্তু আমার অনুরোধে তাকে আবার ঢেকি গিলতে হল। তারপর দুই বন্ধু মিলে বের হলাম বাগেরহাটের দর্শনীয় স্থান সমূহের সৌর্ন্দয উপভোগ করতে। একদিনে আমরা যা দেখলাম ষাট গম্বুজ মসজিদ,এর বিপরীতে সিঙ্গাইর মসজিদ, খানিক দূরে রনবিজয়পুর মসজিদ, খান জাহানের মাজার ও দিঘী, চন্দ্র মহল ইকো পার্ক, মংলা পোর্ট। এখন যখন লিখতে বসলাম তখন নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য মেনে হচ্ছে একদিনে এতগুলো স্পট কিভাবে উপভোগ করলাম। অবশ্য এক্ষেত্রে বন্ধু বাপন সেনের সহযোগিতা অপরিসীম। আপনারাও সপরিবারে এবং সবান্ধবে ঘুরে আসতে পারেন। ভাল লাগার গ্যারান্টি ১০০%।

       

ঐতিহাসিক মূল্য এবং সতর্কতা :ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এর সংস্কার সাধন করা হয়েছে।গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক সংরক্ষিত পুরাকির্তী হিসেবে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয় – “ কোন ব্যক্তি এই পুরাকির্তীর কোন রকম ধ্বংস বা অনিষ্ট সাধন করলে বা এর কোন বিকৃতি বা অঙ্গচ্ছেদ ঘটালে বা এরে কোন অংশের উপর লিখলে বা খোদাই করলে বা কোন চিহ্ন বা দাগ কাটলে,১৯৬৮ সালের ১৪ নং পুরাকির্তী আইনের ১৯ ধারার অধীনে তিনি সবার্ধিক ০১ বৎসর পযর্ন্ত জেল বা জরিমানা বা উভয় প্রকার দন্ডে দন্ডনীয় হবেন।

       

ভ্রমনের ক্ষেত্রে আরো একটি বিষয় লক্ষ রাখতে হবে যে, সরকার ঘোষিত অন্যান্য ছুটির দিনসহ বন্ধ থাকবে। টিকিট মূল্য: ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ০৫(পাচঁ) টাকা।দেশী পর্যটকদের জন্য ২০(বিশ) টাকা এবং বিদেশী পর্যটকদের জন্য ২০০(দুইশত) টাকা।সার্কভৃক্ত দেশ সমূহের জন্য ১০০(একশত ) টাকা।

       

বাগেরহাট জেলায় আরো যা দেখতে পারেন :১। হযরত খান জাহান আলীর মাজার(বাগেরহাট সদর), ২। সিঙ্গাইর/এক গম্বুজ মসজিদ (বাগেরহাট সদর), ৩। নয় গম্বুজ মসজিদ ৪। রণবিজয়পুর মসজিদ ৫। জিন্দাপীর মসজিদ ৬। অযোধ্যা মঠ/ কোদলা মঠ ৭। বাগেরহাট জাদুঘর ৮। সাবেকডাঙ্গা পুরার্কীতি ৯। ঘোড়াদীঘি ১০। মংলা বন্দর ১১। কচিখালী সমুদ্র সৈকত ১২। দুবলার চর ১৩। চন্দ্রমহল ইকোপার্ক,১৪। জামতলা সমুদ্র সৈকত ১৫। কটকা সমুদ্র সৈকত ১৬। সুন্দরবন ১৭। ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদ ১৮। বিবি বেগনী মসজিদ ১৯। দুর্গাপুর শিবা মঠ ২০। চোনাখোলা মসজিদ সহ আরো অনেক দর্শনীয় স্থান।